করোনার কারণে গেলো বছরের মার্চ থেকে বন্ধ রয়েছে দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। দীর্ঘ সময় ধরে সরাসরি পাঠ কার্যক্রম না চলায় দেশে সার্বিক শিক্ষা নিয়ে নানা ধরনের সংকট তৈরি হয়েছে। করোনাকালে শিক্ষা ব্যবস্থার সামগ্রিক অবস্থা তুলে ধরতে ছাত্র-শিক্ষক অভিভাবক মতবিনিময় সভার আয়োজন করে বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়ন।
"করোনা মহামারীর সময় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বেতন-ফি মওকুফ, শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের অগ্রাধিকার ভিত্তিতে করোনার ভ্যাক্সিন প্রদানসহ ৮ দফা দাবি" শীর্ষক মতবিনিময় সভায় বিভিন্ন স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র, শিক্ষক, অভিভাবক ও বিভিন্ন ছাত্র সংগঠনের নেতাকর্মীরা তাদের মতামত তুলে ধরেন।
আলোচনায় সংগঠনটির পক্ষ থেকে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান খুলে দেওয়ার রোডম্যাপ ঘোষণা করা, শিক্ষার আর্থিক দায়িত্ব রাষ্ট্রকে নেওয়ার দাবি করেন বক্তারা।
শুক্রবার (২৯ জানুয়ারি) বিকেলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্রের তৃতীয় তলায় এই মতবিনিময় সভার আয়োজন করা হয়।
সংগঠনটির কেন্দ্রীয় সংসদের সভাপতি ফয়েজ উল্লাহ'র সভাপতিত্বে মতবিনিময় সভা সঞ্চালনা করেন সংগঠনটির সাধারণ সম্পাদক দীপক শীল।
জাতীয় প্রেসক্লাবের সদস্য গণমাধ্যমকর্মী রহমান মোস্তাফিজ বলেন," করোনার সময়ে দেখেছি শিক্ষকরা অনলাইনে ক্লাস নিতে অভ্যস্ত হয়। কিন্তু শিক্ষার্থীদের উপর অনলাইন ক্লাস চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে। সরকার শিক্ষার্থীদের সুবিধা দিবে বলে প্রতিশ্রুতি দিলেও তা বাস্তবায়ন করা হয়নি। হাইকোর্টের রায় অমান্য করা হয়েছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো লাভজনক ব্যবসায় প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে।"
প্রথম আলোর সহ-সম্পাদক সোহরাব হাসান বলেন, "শিক্ষক, শিক্ষার্থী, অভিভাবক, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো করোনার সময় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কিন্তু সরকার এ ব্যাপারে কোন পদক্ষেপ গ্রহণ করে নাই। স্বাধীনতার এতো বছর পরেও শিক্ষাধারার কোন পরিবর্তন হয় নাই। বারবার শিক্ষানীতি ঘোষণা করা হলেও তা বাস্তবায়ন করা হয় নাই। দেশের সকল শিক্ষার্থীকে যুক্ত করে ছাত্রদের যৌক্তিক দাবি আদায় করে নিতে হবে।"
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক ডা. এসএম ফজলুর রহমান বলেন, "করোনার মহামারী ভেতর দেশের বহু মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে গেছে। শিফট করে স্বাস্থ্যবিধি মেনে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ক্লাস শুরু করা প্রয়োজন। সকল বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান খুলে দিলেও ছাত্র আন্দোলনের ভয়ে সরকার এখনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলে দিচ্ছে না। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে গণতান্ত্রিক পরিবেশ ফিরিয়ে আনা দরকার।"
ছাত্র ইউনিয়নের সভাপতি ফয়েজ উল্লাহ বলেন, "বেতন-ফি মওকুফসহ ৮ দফা দাবিসহ শিক্ষার সংকট নিয়ে ছাত্র ইউনিয়ন তার আন্দোলন চালিয়ে যাবে। সকল শিক্ষার্থীকে যুক্ত করে ছাত্র ইউনিয়ন তার লড়াই সংগ্রামকে এগিয়ে নিয়ে যাবে।"
এছাড়াও বক্তব্য রাখেন, ছাত্র ইউনিয়নের সাবেক সভাপতি রুহিন হোসেন প্রিন্স, সাবেক সভাপতি হাসান হাফিজুর রহমান সোহেল, সাবেক সভাপতি ও অভিভাবক ফেরদৌস আহমেদ উজ্জ্বল, বাংলাদেশ কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতির সাংগঠনিক সম্পাদক অধ্যক্ষ আকমল হোসেন, প্রেসিডিয়াম সদস্য অধ্যাপক তনুজ কান্তি দে, প্রকৌশলী আল্লামা আল-রাজি, সাবেক ছাত্রনেতা ও অভিভাবক মোস্তাক হোসেন, ছাত্রমৈত্রীর সভাপতি মোতাহার হোসেন জুয়েল, সমাজতান্ত্রিক ছাত্রফ্রন্টের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সাধারণ সম্পাদক রাজীব কান্তি প্রমুখ।
শিক্ষার্থীদের মধ্যে বক্তব্য রাখেন ভিকারুননিসা স্কুল এন্ড কলেজের দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী মৈত্রী ক্যাডেট, উইলস লিটল ফ্লাওয়ার স্কুল এন্ড কলেজের একাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থী শ্রুতি জ্যাকলিন রোজারিও, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী সজীব সর্দার, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী মুক্ত রেজোয়ান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত সাত কলেজের শিক্ষার্থী জুবাইর হোসাইন সজল, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী অঞ্জন রায় গোস্বামী, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী প্রত্যয় নাফাক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী মাহির শাহরিয়ার রেজা প্রমুখ৷
মতবিনিময় সভায় সংহতি জানান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক এমএম আকাশ, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক কাবেরী গায়েন, অধ্যাপক রুবাইয়াত ফেরদৌস।
মতবিনিময় সভায় ৮ দফা দাবিতে সংহতি জানিয়ে উপস্থিত ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পুষ্টি ও খাদ্যবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক ড. আব্দুজ জাহের, বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়নের সাবেক সভাপতি লুনা নূর, মানবেন্দ্র দেব, সাবেক সহ-সভাপতি মোতালেব হোসেন, যুব ইউনিয়নের সভাপতি হাফিজ আদনান রিয়াদ, সাধারণ সম্পাদক খান আসাদুজ্জামান মাসুমসহ প্রমুখ।
ছাত্র ইউনিয়নের ৮ দফা:
(১) করােনাকালীন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে বেতন ফি মওকুফ করতে হবে। এসাইনমেন্টের নামে আদায়কৃত ফি ফেরত দিতে হবে।
(২) নামে-বেনামে ফি আদায়কারী প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
(৩) বিশেষজ্ঞদের মতামত নিয়ে স্বাস্থ্যবিধি মেনে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলে দেয়ার রােডম্যাপ ঘােষণা করতে হবে।
(৪) সেশনজট রােধে দ্রুত এইচএসসি পরীক্ষার্থীদের ফল প্রকাশ করতে হবে। সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সেশনজট রােধে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।
(৫) পাঠ্যপুস্তকে সাম্প্রদায়িকীকরণ বন্ধ করতে হবে।
(৬) শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলােতে আবাসিক হল খুলে দিয়ে, আবাসনের ব্যবস্থা করে পরীক্ষা নিতে হবে। অছাত্র-সন্ত্রাসীদের হল থেকে বিতাড়ন করতে হবে।
(৭) সকল পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে বাণিজ্যিক কোর্স বন্ধ করতে হবে।
(৮) অগ্রাধিকারভিত্তিতে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের বিনামূল্যে ভ্যাক্সিন দিতে হবে।



0 coment rios: