শুক্রবার, ১০ জুন, ২০১৬

“আগুন পাঠালাম উপহার করে, সে তোমায় পোড়াবে না..... তবে ক্ষমাও করবে না!” (পত্রকথন ০২)

প্রিয় কৃষ্ণচূড়া,
তুমি আমার অদ্ভুত ভালোলাগা! অদ্ভুত ঝামেলা! আয়নার কাছ থেকে শিখেছি, কি করে ক্ষতগুলো লুকিয়ে রাখতে হয়। তোমাকে ভুলে থাকি মানে এই নয় যে ভুলে গেছি। ভুলে থাকি মানে মুখে না বলেও তোমার কথা মনে রেখেছি। সময়ের সাথে সাথে অনেক কিছুই বদলে যায়, তবে মন হয়তো মনে রাখে তার মন খারাপের ইতিহাস। দৃশ্যগুলো একই থাকে, কেবল আমাদের দৃষ্টি ভংগী বদলে যায়।

কতদিন হয়ে গেল, তোমার উপস্থিতির উৎসব হয় না। এখনো সেলফোনের স্ক্রিনে তোমার নাম্বারটা দেখলে কন্ঠে জমা হয় কষ্টের মেঘ। পুরোন না হওয়া স্বাধ গুলোকে আলোচনায় আনি না, আড়ালে রেখে দেই। আড়ালে রেখে যে জীবনটা যাপন করি, সে জীবনটা হয়তো আসল জীবন নয়, বানানো। সংকটময় সময়ে যেমন, কেবল প্রশ্ন থাকে উত্তর থাকে না। জানো তো কষ্ট পাওয়ার অভ্যাস তৈরি করার জন্যও সাহস লাগে। অনিশ্চিত, উদাসীন এবং নিষ্ঠুর রাস্তাটুকু ভ্রমন করাই কষ্টের। তাই তো কাউকে কাউকে হারিয়ে যেতে হয় অদ্ভুত আঁধারে। অন্ধকারে অন্ধের মতো সাতার কাটতে হয় সারাজীবন।

দীর্ঘ দ্বীর্ঘশ্বাসের শব্দে ঘরের নিরবতা ভাংগে। ঘড়ির কাটার টিকটিক শব্দে বাস্তবতায় ফিরি। আমরা একাকী থাকতে চাই, অথচ নিঃস্বংগ হতে চাই না। ইদানিং আমার ঘুম থেকে উঠতে ইচ্ছে করে না। সেই অপ্রিয় বাস্তবতা! মেনে নেয়া, মানিয়ে নেয়া। হাওয়াও ঘরময় ছড়িয়ে দেয়া হাহাকার। দুঃখরা অশরীরী ঘুরে বেড়ায় বসতবাড়ি জুড়ে। ঠিকানাহীন ঠিকানায় প্রতিদিন মনে মনে কিছু গল্প পাঠায় আমি। তুমি পাওতো সেগুলো? কই কখনো তো প্রাপ্তি স্বীকারের বার্তা পেলাম না!!

একটা দরজা ভেতর থেকে বন্ধ থাকার যে অর্থ, বাইরে থেকে বন্ধ থাকার অর্থ এক নয়। একা একা আমার সকাল হয়। দুপুর-বিকেল-রাত গড়ায়। পাথর গুলোও আমার ধৈর্য্য দেখে অতিষ্ঠ। নষ্ট ঘড়ির মতো মুখ বন্ধ করে পড়ে আছি। আমার জন্য খুব গোপনেও কী তোমার একবার দুঃখ হয় না? আমাদের মধ্যকার নিরবতা গুলো প্রাচীরের মতো দুর্ভেদ্য। মাথা ঠুকলে মাথা ফাঁটে শুধু, দেয়ালের সামান্যতম কিছু হয় না।

জ্যামিতিক মেঘেঢাকা আকাশের বিপ্রতীপ কোণে একটা কিছু আছে, যাকে আমি মাঝে মধ্যে-ই তুমি ভেবে ভুল করে ফেলি। তুমি কি এখনো সেই পুরনো ঠিকানাতেই আছো? যার কাছে আমার কপালের টিপ রয়ে গেছে, তার জন্য পিছু টানকে, এই সমাজ উপেক্ষা করতে পারে, আমি পারি না। হিসেব কষতে শুরু করলে সম্পর্ক তার সৌন্দর্য্য হারায়। অথচ হিসেবের খাতায় প্রাপ্তির কথাও তো থাকে। তারপরও হিসেব বরাবর-ই বড় নেতিবাচক শব্দ! সবকিছুর জেনে-বুঝেও দিন শেষে অনেক হিসেব করে বেহিসেবি ভাবেই "ভালোবাসি!" জাহাজ না হলে কি বন্দরের দেখা পাওয়া যায়? ঘাট পারাপার আর সমুদ্র বিজয় তো এক কথা নয়!! বিদায় কখনো আয়োজন করে হয় না। বিদায় নিতে হয় হুট করে! আয়োজিত বিদায় প্রলম্বিত হয়ে কেবল বেদনা বোধকে বাড়ায়। দুঃখের বাহ্যিক প্রকাশে আমার বিশ্বাস নেই, তাই জীবনটাকে কেঁদে ভাসিয়ে দেয়ার চেয়ে, হেসে উড়িয়ে দেয়াতেই আমার আগ্রহ বেশি।

“আগুন পাঠালাম উপহার করে।সে তোমায় পোড়াবে না..... তবে ক্ষমাও করবে না!” বেঁচে থাকার উষ্ণতাটুকু স্মৃতির কাছেই মেলে। ভালো থেকো, এই অবস্থায় যতটুকু ভালো থাকা যায়। জীবনের নাট্যশালার বিপরীত মঞ্চের সহশিল্পী আমার!

ইতি
রাধাচূড়া
০৫-০৬-১৬

..................................................

প্রিয় রাধাচুড়া,

তোমার সম্পর্কে বাড়িয়ে বলার প্রয়োজন নেই, আবার তোমাকে উপেক্ষা করবারও উপায় নেই। আমার বোধহয় ব্যর্থতার অনুবর্তন চলছে। মানুষ চায় ভুলে থাকতে, সান্ত্বনা পেতে। ছোট হয়ে যাওয়া মন আর নিচু হয়ে যাওয়া রুচি নিয়ে তোমার সামনে দাড়াবার সাহসটুকু সঞ্চয় করতে পারছি না। আমি তোমার ক্রোধেরও অযোগ্য। তাই সৈনিকের মতো জিজ্ঞাসাহীন সময় পার করছি।

সংসার তো কোনো সম্পর্ক নয়। সংসার আসলে সহনশীলতা। বৈচিত্র্য আছে বলেই পৃথিবীটা সুন্দর। জীবনটা দ্রুত এবং সংক্ষেপ, সেখানে ইচ্ছে আর অহং এর সুক্ষ রেষারেষি আছে। তাই আকাংক্ষা পূরনের অপারগতার প্রতি অপরিসীম সহিষ্ণুতা নিয়ে বেঁচে আছি।

তোমার গল্প প্রতিদিন পাই। কিন্তু প্রাপ্তি স্বীকারে, আভিজাত্যের অপরিহার্যতা অনুভব করলেও, বার্তা পাঠাতে অপারগ। অনেক সময়ই এমন হয়, ভাব থাকে কিন্তু ভাষা থাকে না। অপারগতাকেও মর্যাদা দিতে হয়। নিজের জীবনকে নিজেই অপমান করে চলেছি, সেও তো এক ধরনের আত্মহত্যা। অনুভবকে ভাষায় প্রকাশ করতে পারার যে কি আনন্দ, তা কেবল তারাই জানে যারা সেটা করতে পারে। কত অজস্র সকাল, বিকেল দুপুর অপচয় হয়েছে! তার হিসেব না করাই বুদ্ধিমানের কাজ। মায়াময় উদ্বেগ নিয়ে তোমার প্রতি প্রেমের প্রকাশ করা এখন আমার জন্য বাতুলতা। ব্যাক্তিগত দেউলিয়াপনা। মানসিক আবহাওয়া বিক্ষিপ্ত থাকলেই মানুষ নির্দ্বিধায় ভুল সিদ্ধান্ত নেয়ার ঝুঁকি নেয়। এবং সেটাই নিয়েছিলামও। মাঝে মাঝে কর্তৃত্ব গ্রহনের মধ্যেও একধরনের গ্লানি থাকে। তোমার অভিমান গুলোকে শরতের মেঘ করে দাও। বৃষ্টি ঝরেই রোদের ঝিলিক দেখা দিক। জীবনের ফাঁকফোকর গুলো রিপু করে নিয়ে কেবল টিকে থাকা যায়, ভালো থাকা যায় না।

তোমার চিঠি পেয়ে খারাপ লাগা, অভিমান, ক্রোধ, অপমান বোধ, ঠিক কী অনুভূতি যে হয় আমার! বলতে পারবো না। আমাকে নিয়ে তোমার উদ্বেগের আলাদা একটা প্রাণ আছে। নিরবতার গাঢ় অন্ধকারে বসে কি যে অসহ্য লাগে!! মাঝে মাঝেই বিষণ্ণ হাসিতে অপ্রাপ্তিকে আরো দ্বিগুন করে ফেলি। একটা হিমশীতল মানুষের কাছে উষ্ণতাটা বড় বিপ্রকর্ষী। এখন প্রতিটি ভোরকে আমার নির্দয় মনে হয়, কাজে বেরুবার অজুহাত। প্রতিটি রাত অবজ্ঞার কেবল কাটানোর প্রস্তুতি। অস্বচ্ছন্দ চুক্তিপত্র থেকে দূরবর্তী মায়াবী রহস্যময়তা উপভোগ করা যায় না। প্রশ্নের উত্তর হয়, অভিযোগের নয়। আমাদের বিচ্ছেদের মধ্যে অত্যন্ত অমর্যাদাকর কিছু ছিলো যা সহ্য করা কঠিন। স্মৃতিকে মূর্ত করে রাখতে হয়। মায়াবী রহস্যময় বেদনাবোধকে নিজস্ব করে বেঁচে আছি। তুমি ভালো থেকো সত্যের অনেক কাছাকাছি।

ইতি
কৃ্ষ্ণচূড়া

শেয়ার করুন

Author:

Etiam at libero iaculis, mollis justo non, blandit augue. Vestibulum sit amet sodales est, a lacinia ex. Suspendisse vel enim sagittis, volutpat sem eget, condimentum sem.

0 coment rios: