Uncategorized লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
Uncategorized লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

শুক্রবার, ১১ নভেম্বর, ২০১৬

কোন কিছুই ফেলনা নয়

কোন কিছুই ফেলনা নয়

বনের মধ্যে পড়ন্ত বিকাল। খরগোশ ও সজাঁরু, দুই বন্ধু, গল্প করতে করতে বাড়ি ফিরছিল।

এই সময় কিছু একটাতে হোঁচট খেয়ে খরগোশ মহা বিরক্ত হয়ে এক লাথিতে তা পথ থেকে সরিয়ে দিল। সজাঁরু তা লক্ষ্য করছিল, দৌড়ে গিয়ে তা কুড়িয়ে এনে বলল, “বাহ, কি সুন্দর একটা লাঠি পেলাম, খুব তো উড়িয়ে দিচ্ছিলে, দেখো, এটা কত কাজে লাগে।” খরগোশ কিছু না বলে মুচকি হাসল। তারা আবার পথ চলা শুরু করল।

কিছুদূর পরে হঠাৎ দেখা গেল পথ শেষ, সামনে একটা উঁচু ধাপ। খরগোশ এক লাফে উপরে উঠে টিটকারির সুরে বলল, “সঁজারু ভায়া, তুমি তো আবার লাফাতে পার না। কি করবে? কোনও ঘুর পথ ধরে না হয় এসো, আমি বসি।” সজাঁরু কিছুই না বলে একটু ভাবল, তারপর লাঠিটির উপর ভর করে পোল-ভল্টের কায়দায় লাফ দিয়ে উপরে উঠে এল। খরগোশ অবাক।

“দেখলে ফেলনা জিনিস কি কাজ লাগে। চল, সময় হলে আরও কাজ দেখবে।” সঁজারু বলল।

একটু পরে চলার পথে কিছু ফলের গাছের দেখা মিলল। খুব সুন্দর সুন্দও পাকা ফল হযেছে, ঘ্রাণে মৌ মৌ, খরগোশ অনেক লাফ-ঝাঁপ করল, কিন্তু নাগাল পেল না। এদিকে সজাঁরু তার লাঠিটিকেই ছুঁড়ে মারল ও এতে ঝরঝর করে অনেক ফল পড়ল। লাঠিটি লগির কায়দায় ব্যবহার করেও কিছু ফল পাড়ল। পেট ভরে খেয়ে তারা আবার এগুল। কিন্তু, একটু পর একটা পনির নালা তাদের পথ আঁটকাল। খরগোশও তা লাফিয়ে পার হতে পারবে না বলে জানাল। কিন্তু সজাঁরু লাঠিটি সাঁকোর মতো করে পাতালো ও দুজনে তার উপর দিয়ে হেঁটে পার হল।

এদিকে অন্ধকার হয়ে এলে কয়েকটি শেয়াল এসে খরগোশের উপর হামলা করল। কাঁটার ভয়ে সজাঁরুর দিকে তারা এগুল না, কিন্তু তাই বলে সজাঁরু বসে রইল না। সে লাঠিটি নিয়ে দমাদম শেয়ালগুলিকে পেটাতে লাগল। এই অদ্ভুত অস্ত্রের আঘাতে বাবারে মারে বলে শেয়ালগুলি পালাল। খরগোশ বসে বসে হাঁপাচ্ছিল, কোথায়ও তেমন না লাগলেও ভয়েই সে আধমরা, ভাল করে হাঁটতে পারছিল না। সঁজারু তাকে লাঠিটি দিল, তা নিয়ে সে ঠুক ঠুক করে এগুল।

একটু পরে তারা খরগোশের বাড়ি পৌঁছুলো, খরগোশের বউ বাচ্চারা খুব চিন্তা করছিল। খরগোশ তার বৌকে বলল, “এই দেখো, এই বন্ধু আমার জীবন বাঁচিয়েছে।” “আমি না, এই লাঠি।” সঁজারুর এই কথা শুনে খরগোশ পরিবারের সবাই হাসল ও এরপর খুব সমীহ সহকারে লাঠিটিতে হাতে নিল। “এবং আপনাদের এই লাঠিটি আমি উপহার দিলাম” সঁজারুর এই কথা শুনে তারা যে কি খুশী হল। খরগোশের বৌ বলল, “ভাইয়া, তবে একটা শর্তে, আপনাকে আজ খেয়ে যেতে হবে।” খরগোশ বলল, “না, আজ তুমি মেহমান, রাতটা থেকেই যাও।” সঁজারু মুচকি হেসে রাজী হয়ে গেল।

শুক্রবার, ১০ জুন, ২০১৬

“আগুন পাঠালাম উপহার করে, সে তোমায় পোড়াবে না..... তবে ক্ষমাও করবে না!” (পত্রকথন ০২)

“আগুন পাঠালাম উপহার করে, সে তোমায় পোড়াবে না..... তবে ক্ষমাও করবে না!” (পত্রকথন ০২)

প্রিয় কৃষ্ণচূড়া,
তুমি আমার অদ্ভুত ভালোলাগা! অদ্ভুত ঝামেলা! আয়নার কাছ থেকে শিখেছি, কি করে ক্ষতগুলো লুকিয়ে রাখতে হয়। তোমাকে ভুলে থাকি মানে এই নয় যে ভুলে গেছি। ভুলে থাকি মানে মুখে না বলেও তোমার কথা মনে রেখেছি। সময়ের সাথে সাথে অনেক কিছুই বদলে যায়, তবে মন হয়তো মনে রাখে তার মন খারাপের ইতিহাস। দৃশ্যগুলো একই থাকে, কেবল আমাদের দৃষ্টি ভংগী বদলে যায়।

কতদিন হয়ে গেল, তোমার উপস্থিতির উৎসব হয় না। এখনো সেলফোনের স্ক্রিনে তোমার নাম্বারটা দেখলে কন্ঠে জমা হয় কষ্টের মেঘ। পুরোন না হওয়া স্বাধ গুলোকে আলোচনায় আনি না, আড়ালে রেখে দেই। আড়ালে রেখে যে জীবনটা যাপন করি, সে জীবনটা হয়তো আসল জীবন নয়, বানানো। সংকটময় সময়ে যেমন, কেবল প্রশ্ন থাকে উত্তর থাকে না। জানো তো কষ্ট পাওয়ার অভ্যাস তৈরি করার জন্যও সাহস লাগে। অনিশ্চিত, উদাসীন এবং নিষ্ঠুর রাস্তাটুকু ভ্রমন করাই কষ্টের। তাই তো কাউকে কাউকে হারিয়ে যেতে হয় অদ্ভুত আঁধারে। অন্ধকারে অন্ধের মতো সাতার কাটতে হয় সারাজীবন।

দীর্ঘ দ্বীর্ঘশ্বাসের শব্দে ঘরের নিরবতা ভাংগে। ঘড়ির কাটার টিকটিক শব্দে বাস্তবতায় ফিরি। আমরা একাকী থাকতে চাই, অথচ নিঃস্বংগ হতে চাই না। ইদানিং আমার ঘুম থেকে উঠতে ইচ্ছে করে না। সেই অপ্রিয় বাস্তবতা! মেনে নেয়া, মানিয়ে নেয়া। হাওয়াও ঘরময় ছড়িয়ে দেয়া হাহাকার। দুঃখরা অশরীরী ঘুরে বেড়ায় বসতবাড়ি জুড়ে। ঠিকানাহীন ঠিকানায় প্রতিদিন মনে মনে কিছু গল্প পাঠায় আমি। তুমি পাওতো সেগুলো? কই কখনো তো প্রাপ্তি স্বীকারের বার্তা পেলাম না!!

একটা দরজা ভেতর থেকে বন্ধ থাকার যে অর্থ, বাইরে থেকে বন্ধ থাকার অর্থ এক নয়। একা একা আমার সকাল হয়। দুপুর-বিকেল-রাত গড়ায়। পাথর গুলোও আমার ধৈর্য্য দেখে অতিষ্ঠ। নষ্ট ঘড়ির মতো মুখ বন্ধ করে পড়ে আছি। আমার জন্য খুব গোপনেও কী তোমার একবার দুঃখ হয় না? আমাদের মধ্যকার নিরবতা গুলো প্রাচীরের মতো দুর্ভেদ্য। মাথা ঠুকলে মাথা ফাঁটে শুধু, দেয়ালের সামান্যতম কিছু হয় না।

জ্যামিতিক মেঘেঢাকা আকাশের বিপ্রতীপ কোণে একটা কিছু আছে, যাকে আমি মাঝে মধ্যে-ই তুমি ভেবে ভুল করে ফেলি। তুমি কি এখনো সেই পুরনো ঠিকানাতেই আছো? যার কাছে আমার কপালের টিপ রয়ে গেছে, তার জন্য পিছু টানকে, এই সমাজ উপেক্ষা করতে পারে, আমি পারি না। হিসেব কষতে শুরু করলে সম্পর্ক তার সৌন্দর্য্য হারায়। অথচ হিসেবের খাতায় প্রাপ্তির কথাও তো থাকে। তারপরও হিসেব বরাবর-ই বড় নেতিবাচক শব্দ! সবকিছুর জেনে-বুঝেও দিন শেষে অনেক হিসেব করে বেহিসেবি ভাবেই "ভালোবাসি!" জাহাজ না হলে কি বন্দরের দেখা পাওয়া যায়? ঘাট পারাপার আর সমুদ্র বিজয় তো এক কথা নয়!! বিদায় কখনো আয়োজন করে হয় না। বিদায় নিতে হয় হুট করে! আয়োজিত বিদায় প্রলম্বিত হয়ে কেবল বেদনা বোধকে বাড়ায়। দুঃখের বাহ্যিক প্রকাশে আমার বিশ্বাস নেই, তাই জীবনটাকে কেঁদে ভাসিয়ে দেয়ার চেয়ে, হেসে উড়িয়ে দেয়াতেই আমার আগ্রহ বেশি।

“আগুন পাঠালাম উপহার করে।সে তোমায় পোড়াবে না..... তবে ক্ষমাও করবে না!” বেঁচে থাকার উষ্ণতাটুকু স্মৃতির কাছেই মেলে। ভালো থেকো, এই অবস্থায় যতটুকু ভালো থাকা যায়। জীবনের নাট্যশালার বিপরীত মঞ্চের সহশিল্পী আমার!

ইতি
রাধাচূড়া
০৫-০৬-১৬

..................................................

প্রিয় রাধাচুড়া,

তোমার সম্পর্কে বাড়িয়ে বলার প্রয়োজন নেই, আবার তোমাকে উপেক্ষা করবারও উপায় নেই। আমার বোধহয় ব্যর্থতার অনুবর্তন চলছে। মানুষ চায় ভুলে থাকতে, সান্ত্বনা পেতে। ছোট হয়ে যাওয়া মন আর নিচু হয়ে যাওয়া রুচি নিয়ে তোমার সামনে দাড়াবার সাহসটুকু সঞ্চয় করতে পারছি না। আমি তোমার ক্রোধেরও অযোগ্য। তাই সৈনিকের মতো জিজ্ঞাসাহীন সময় পার করছি।

সংসার তো কোনো সম্পর্ক নয়। সংসার আসলে সহনশীলতা। বৈচিত্র্য আছে বলেই পৃথিবীটা সুন্দর। জীবনটা দ্রুত এবং সংক্ষেপ, সেখানে ইচ্ছে আর অহং এর সুক্ষ রেষারেষি আছে। তাই আকাংক্ষা পূরনের অপারগতার প্রতি অপরিসীম সহিষ্ণুতা নিয়ে বেঁচে আছি।

তোমার গল্প প্রতিদিন পাই। কিন্তু প্রাপ্তি স্বীকারে, আভিজাত্যের অপরিহার্যতা অনুভব করলেও, বার্তা পাঠাতে অপারগ। অনেক সময়ই এমন হয়, ভাব থাকে কিন্তু ভাষা থাকে না। অপারগতাকেও মর্যাদা দিতে হয়। নিজের জীবনকে নিজেই অপমান করে চলেছি, সেও তো এক ধরনের আত্মহত্যা। অনুভবকে ভাষায় প্রকাশ করতে পারার যে কি আনন্দ, তা কেবল তারাই জানে যারা সেটা করতে পারে। কত অজস্র সকাল, বিকেল দুপুর অপচয় হয়েছে! তার হিসেব না করাই বুদ্ধিমানের কাজ। মায়াময় উদ্বেগ নিয়ে তোমার প্রতি প্রেমের প্রকাশ করা এখন আমার জন্য বাতুলতা। ব্যাক্তিগত দেউলিয়াপনা। মানসিক আবহাওয়া বিক্ষিপ্ত থাকলেই মানুষ নির্দ্বিধায় ভুল সিদ্ধান্ত নেয়ার ঝুঁকি নেয়। এবং সেটাই নিয়েছিলামও। মাঝে মাঝে কর্তৃত্ব গ্রহনের মধ্যেও একধরনের গ্লানি থাকে। তোমার অভিমান গুলোকে শরতের মেঘ করে দাও। বৃষ্টি ঝরেই রোদের ঝিলিক দেখা দিক। জীবনের ফাঁকফোকর গুলো রিপু করে নিয়ে কেবল টিকে থাকা যায়, ভালো থাকা যায় না।

তোমার চিঠি পেয়ে খারাপ লাগা, অভিমান, ক্রোধ, অপমান বোধ, ঠিক কী অনুভূতি যে হয় আমার! বলতে পারবো না। আমাকে নিয়ে তোমার উদ্বেগের আলাদা একটা প্রাণ আছে। নিরবতার গাঢ় অন্ধকারে বসে কি যে অসহ্য লাগে!! মাঝে মাঝেই বিষণ্ণ হাসিতে অপ্রাপ্তিকে আরো দ্বিগুন করে ফেলি। একটা হিমশীতল মানুষের কাছে উষ্ণতাটা বড় বিপ্রকর্ষী। এখন প্রতিটি ভোরকে আমার নির্দয় মনে হয়, কাজে বেরুবার অজুহাত। প্রতিটি রাত অবজ্ঞার কেবল কাটানোর প্রস্তুতি। অস্বচ্ছন্দ চুক্তিপত্র থেকে দূরবর্তী মায়াবী রহস্যময়তা উপভোগ করা যায় না। প্রশ্নের উত্তর হয়, অভিযোগের নয়। আমাদের বিচ্ছেদের মধ্যে অত্যন্ত অমর্যাদাকর কিছু ছিলো যা সহ্য করা কঠিন। স্মৃতিকে মূর্ত করে রাখতে হয়। মায়াবী রহস্যময় বেদনাবোধকে নিজস্ব করে বেঁচে আছি। তুমি ভালো থেকো সত্যের অনেক কাছাকাছি।

ইতি
কৃ্ষ্ণচূড়া

মঙ্গলবার, ২২ মার্চ, ২০১৬

২২ মার্চ বিশ্ব পানি দিবসঃ তেল বা গ্যাস নয়, আগামীতে যুদ্ধ হবে পানি নিয়ে

২২ মার্চ বিশ্ব পানি দিবসঃ তেল বা গ্যাস নয়, আগামীতে যুদ্ধ হবে পানি নিয়ে

আজ ২২ মার্চ বিশ্ব পানি দিবস। ১৯৯২ সালে ব্রাজিলের রিও ডি জেনিরোতে রাষ্ট্রসংঘ পরিবেশ ও উন্নয়ন সম্মেলনের (ইউএনসিইডি) এজেন্ডা ২১-এ প্রথম বিশ্ব জল দিবস পালনের আনুষ্ঠানিক প্রস্তাবটি উত্থাপিত হয় এবং ১৯৯৩ সালে প্রথম বিশ্ব জল দিবস পালিত হয়। এর পর থেকে এই দিবস পালনের গুরুত্ব ক্রমশ বৃদ্ধি পেতে থাকে। রাষ্ট্রসংঘের সদস্য দেশগুলি এই দিনটিকে নিজ নিজ রাষ্ট্রসীমার মধ্যে রাষ্ট্রসংঘের জলসম্পদ সংক্রান্ত সুপারিশ ও উন্নয়নপ্রস্তাবগুলির প্রতি মনোনিবেশের দিন হিসেবে উৎসর্গ করেন। প্রতি বছর বিশ্ব জল দিবস উপলক্ষ্যে রাষ্ট্রসংঘের বিভিন্ন সংস্থার যে কোনো একটি বিশেষ কর্মসূচি পালন করে থাকে। ২০০৩ সালে প্রতিষ্ঠার পর থেকে রাষ্ট্রসংঘ-জল বিশ্ব জল দিবসের থিম, বার্তা ও প্রধান সংস্থা নির্বাচনের দায়িত্বে রয়েছে। নদীমাতৃক বাংলাদেশে সাড়ে নয় কোটি মানুষ বিশুদ্ধ পানি ব্যবহার করতে পারছে না। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (হু) এ তথ্য জানিয়ে বলছে, বাংলাদেশের মানুষ ঝুঁকির মধ্যে বাস করছে। কারণ ১৬ কোটি মানুষের বাংলাদেশে ৯৭ ভাগ মানুষের পানি প্রাপ্যতা নিশ্চিত করা হলেও বিশুদ্ধ পানির অভাব এবং মৌসুম ভেদে পানি সঙ্কটের কারণে স্বাস্থ্য সুরক্ষা বিঘ্নিত হচ্ছে। শিল্পোন্নয়ন ও কৃষিকাজও মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। এই বাস্তবতায় আজ মঙ্গলবার পালিত হচ্ছে ‘বিশ্ব পানি দিবস’। বিশ্বব্যাপী পানির অপরিহার্যতা বিবেচনা করে এবছর পানি দিবসের প্রতিপাদ্য নির্ণয় করা হয়েছে, Water and Jobs “পানি এবং কর্মসংস্থান"। জাতিসংঘ বলছে, বিশুদ্ধ পানি ভাল কর্মসংস্থানের সুযোগ এনে দেয়। পরিসংখ্যানে প্রকাশ, পৃথিবীতে মোট শ্রমশক্তির প্রায় অর্ধেক জনশক্তিই পানি সংক্রান্ত এবং পানিকে ঘিরে জীবিকা নির্বাহের কাজে নিয়োজিত রয়েছে। সারা বিশ্বে বিভিন্ন কর্মে নিয়োজিত সে সংখ্যা প্রায় দেড় বিলিয়ন। আগামী ২০৩০ সালের মধ্যে সারা বিশ্বে বিশুদ্ধ পানি, স্যানিটেশন এবং স্বাস্থ্যবিধি নিশ্চিত করতে জাতিসংঘ কাজ করছে এবং এই কাজ করতে অন্যদেরও প্রভাবিত করা হচ্ছে।
জীবন ধারণের অতি জরুরী উপকরণ পানি বিশ্বের সর্বত্রই একটি স্পর্শকাতর বিষয়। অথচ বিশ্বের ৭৪ কোটি ৮০ লাখ মানুষ দূষিত উৎসের পানি ব্যবহার করে। এর অর্ধেক হচ্ছে সাব-সাহারান আফ্রিকার মানুষ ও অবশিষ্ট অর্ধেকের বেশির ভাগের বাস এশিয়ায় এবং তাদের অধিকাংশই পল্লী অঞ্চলে বাস করে। পৃথিবীর শতকরা ৭১% পানি হিসেবে থাকলেও এর মাত্র ৩% খাবার যোগ্য যার বিরাট অংশই এন্টার্কটিকা ও গ্রীনল্যান্ডে বরফ হিসেবে জমা আছে অথবা মাটির নীচে। হিসেব করলে দেখা যায় যে, পৃথিবীর মোট পানির মাত্র ০.০১ শতাংশ মানুষের ব্যবহারোপযোগী। তাও আবার পৃথিবীর অধিকাংশ মানুষের নাগালের বাইরে। আধুনিক বিশ্বে যখন বিজ্ঞানের জয় জয়কার সেখানে প্রায় ১৫০ কোটিরও বেশী মানুষের জন্য নাই নিরপদ পানির ব্যবস্থা, আর প্রতি বছর শুধু পানি বাহিত রোগে ভুগে মারা যাচ্ছে প্রায় সাড়ে তিন কোটি মানুষ। আমাদের দেশে পানযোগ্য পানির প্রধান উৎস নদী-খাল-বিল, হাওর-বাঁওড়, পুকুর ও জলাশয়। এক সময় এ দেশে ১ হাজারের বেশি নদী থাকলেও সেগুলোর বেশিরভাগই এখন মরে গেছে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের সর্বশেষ হিসাবে বর্তমানে দেশে নদীর সংখ্যা ৩১০ এ নেমে এসেছে। পরিবেশ বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, বর্তমানে নদ-নদীতে পানির চেয়ে বর্জ্যই বেশী। আবার নদীর পানি শুকিয়ে যাবার ফলে কৃষিখাতেও দেখা দিয়েছে বিপর্যয়। সবমিলে ঝুঁকিতে রয়েছে জনস্বাস্থ্য। ফলে বাড়ছে নানাধরনের রোগ। এদিকে তিস্তা নদীর পানি যে পরিমাণ কমেছে তাতে প্রবাহ শূন্যতে নেমে এসেছে। বিশেষ করে উত্তরাঞ্চলে আসন্ন বোরো উৎপাদন কমবে তিনশ কোটি টাকার। এছাড়া রাজধানীর চারদিকে শীতলক্ষ্যা, তুরাগ, বালু ও বুড়িগঙ্গা নদীতে পানির চেয়ে বর্জ্যই বেশি। এক শ্রেণীর অসচেতন ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের কারণে গৃহস্থালি বর্জ্য, হাসপাতালের বর্জ্য, শিল্প বর্জ্য, নগরবাসীর পয়ঃবর্জ্য, ট্যানারি শিল্পের বর্জ্য, নৌ-যানের তেল, ময়লাসহ নানা ধরনের বর্জ্যে প্রতিনিয়ত দূষিত হচ্ছে নদীগুলো। বর্জ্যের সংমিশ্রণে নদীগুলোর পানি কালো, নীল বা লাল রঙ ধারণ করছে। দূষিত ওই নদীর পানি ব্যবহারে হুমকিতে পড়ছে জনস্বাস্থ্য। এ চার নদীকে সরকার আগেই ‘প্রতিবেশ সঙ্কটাপন্ন’ ঘোষণা করেছে। পরিবেশ অধিদপ্তরের হিসাব অনুযায়ী, অধিদপ্তরের মাধ্যমে পরীক্ষিত বর্জ্য ১৩টি নদীর মধ্যে বুড়িগঙ্গা, তুরাগ ও বালুর পানির মান খুবই খারাপ। অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআইডব্লিউটিএ) হিসাবে, বুড়িগঙ্গা, শীতলক্ষ্যা, বালু ও তুরাগ এই চার নদীতে আছে প্রায় চারশ’র মতো বর্জ্যমুখ।
নিরাপদ পানি ও স্যানিটেশন হচ্ছে কলেরা, ডায়রিয়া, ডিসেন্ট্রি, হেপাটাইটিস-এ, টাইফয়েডের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের মোক্ষম হাতিয়ার। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ওয়াটার ও স্যানিটেশন শাখার সমন্বয়ক গর্ডন বলেন, মলমূত্র ইত্যাদি অনেক রোগের প্রধান উৎস এবং এক্ষেত্রে ব্যবস্থা গ্রহণ জরুরি। তিনি বলেন, দূষিত পানি, স্যানিটেশনের অভাব ও স্বাস্থ্য বিধি সম্পর্কে অসচেতনতার কারণে সৃষ্ট ডায়রিয়াজনিত রোগে প্রতি বছর ৮ লাখ ৪২ হাজার মানুষ মারা যায়। জাতিসংঘের এক রিপোর্টে বলা হয়েছে বিশ্বব্যাপী বিগত দু’দশকে সুপেয় পানি ও পরিচ্ছন্ন স্যানিটেশন ব্যবস্থার অনেক উন্নতি হয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও ইউনিসেফের এক রিপোর্টে বলা হয়েছে, ২০১২ সালের শেষে বিশ্বের ৮৯ শতাংশ মানুষ উন্নত পানি সরবরাহের আওতায় এসেছে, যা বিগত দু’দশকের চেয়ে ১৩ শতাংশ বেশি। তবে এই অগ্রগতি সত্ত্বেও ৭৪ কোটি ৮০ লাখ মানুষ দূষিত উৎস থেকে পানি ব্যবহার করে। জারে ভর্তি মিনারেল ওয়াটারের নামে খাওয়ানো হচ্ছে দূষিত পানি। রাজধানী ঢাকা ও তার আশে পাশে বৈধ ও অবৈধভাবে গড়ে ওঠা প্রায় তিনশত কারখানায়ই উৎপাদন হচ্ছে দূষিত খাবার পানি। দু-একটি বাদে অধিকাংশ মিনারেল ওয়াটারের কারখানা স্থাপন করা হয়েছে অপরিচ্ছন্ন স্থানে। রাজধানীর অনেক এলাকাতেই বর্তমানে পানির সংকট চলছে। অনেক এলাকায় পানি পাওয়া গেলেও তাদে দূগন্ধ ও ময়লা। সরাসরি ওয়াসার সাপ্লাই পানি পান করলে পেটের পীড়াসহ নানা অসুখ-বিসুখে ভুগতে হয়। আর এ সব কারণেই সামর্থ্যবান মানুষ এখন বিশুদ্ধ খাবার পানির জন্য বেসরকারী খাতের মিনারেল ওয়াটারের ওপর নির্ভরশীল।
পৃথিবীর সকল প্রাণেরই উৎস পানি এবং সকলেই পানির ওপর নির্ভরশীল। পৃথিবীর ৭০০কোটি মানুষ কোটি মানুষ আজ খাদ্য ও জ্বালানির মতো মৌলিক বিষয়ের পাশাপাশি যে বিরাট চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি তা হচ্ছে সবার জন্য বিশুদ্ধ ও পর্যাপ্ত নিরাপদ খাবার পানি। আর যেসব অ্যঞ্চলে পানি স্বল্পতা সেসব অঞ্চলে সৃষ্টি হচ্ছে পানি যুদ্ধের সম্ভাবনা। যেমন লেবানন-ইসরায়েল এর মধ্যে হাসবানি নদীর পানি নিয়ে বিরোধ, তেমনি তুরস্ক-সিরিয়া ও ইরাকের মধ্যে ইউফেটিস নিয়ে, সিরিয়া ও ইসরায়েলের মধ্যে গ্যালিলি সাগর নিয়ে। ইসরায়েল-ফিলিস্তান ও জর্দানের মধ্যে জর্দান নদী নিয়ে সুদান, মিশর, ইথিওপিয়া ও আরো কিছু দেশের মধ্যে নীলনদ নিয়ে, সেনেগাল ও মৌরিতানিয়ার মধ্যে সেনেগাল নদী নিয়ে, ইরান ও আফগানিস্থানের মধ্যে হেলম্যান্ড নদী নিয়ে আর বাংলাদেশ-ভারতের মধ্যে বিবাদতো আছেই। তাই পানি ব্যবস্থাপনা নিয়ে আমাদের নুতন করে ভাবতে হবে। আমাদেরকে অবশ্যই পানির যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। পানি নিয়ে উদ্ভুত সকল সমস্যার সমাধানে বাস্তবশুখী পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে তা না হলে অচিরেই বিশ্ব সোনা-রূপা হিরা জহরত নয়, যুদ্ধে লিপ্ত হবে পানি নিয়ে। বিশুদ্ধ পানির নিশ্চয়তা আর পানির উৎসের কার্যকর ব্যবহারে গুরুত্ব দেওয়া হবে বিশ্ব পানি দিবসে এই প্রত্যাশা আমাদের।