শান্তির কালে সাহিত্যও ঠিক সেই কাজ করে- স্যার এ এফ রহমান।”
ইতিহাসের
পাতায় স্বর্ণাক্ষরে লিখিত মানুষটিই সবার কাছে বরেণ্য ব্যক্তিত্ব হিসেবে
পরিচিত, তার নাম স্যার এ,এফ রহমান। এ উপমহাদেশে যতবার তার নাম উচ্চারিত
হয়েছে ততবারই উন্মোচিত হয়েছে তার এক বিশাল কর্মমুখর জীবনগাঁথা যার পরতে
পরতে ছড়িয়ে আছে তার কর্মশৈলীর অবাধ প্রস্ফুটন। তিনি জীবনের রঙ্গমঞ্চে
আবির্ভূত হয়েছেন স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য নিয়ে। কখনো শিক্ষাবিদ, কখনো
রাজনীতিবীদ বা সমাজ সংস্কারকের চিন্তানায়ক হিসেবে। গ্রিক উপকথায় ফিনিক্স
পাখির মতই তার রেখে যাওয়া চেতনা আমাদের পথ দেখাবে আর মঙ্গলের দ্বার উন্মোচন
করবে।
কৃতি
এ মানুষটির সে সময় সুযোগ ছিল বিলেতে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার। ইংল্যান্ডয়ের
নামি-দামি কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠদান সহ প্রস্তাব ও সুযোগ পেয়েছিলেন
উঁচু শ্রেণির চাকরি নিয়ে দিন যাপনের। কিন্তু দেশমাতৃকার টানে তিনি ফিরে
এসেছিলেন সব বিত্তবৈভব ফেলে।
স্যার
এ এফ রহমানের পুরো নাম আহমেদ ফজলুর রহমান। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় যদি পূর্ব
বাংলার বুদ্ধিবৃত্তিক আঁতুড়ঘর হয় তবে স্যার এ এফ রহমান বাঙালি হিসেবে প্রথম
বাতি দিয়েছিলেন তাতে। যিনি একরকম বদলে দিয়েছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের ধারণা।
বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চায় তিনি স্বাক্ষর রেখেছেন শুধু ভারতবর্ষেই নয়, পুরো
বিশ্বে। আহমেদ ফজলুর রহমান সম্পর্কে জানার আগে আমাদেরকে ফিরে যেতে হবে ঢাকা
বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাকালীন ইতিহাসে। কেননা এই বিশ্ববিদ্যালয়ের
প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকেই অনেক স্মৃতি জড়িয়ে আছে কৃতি এই মানুষটির সাথে।
স্যার এ এফ রহমান: জন্ম ও শিক্ষাজীবন
তার
জন্ম এমন এক সময়ে যখন বাংলার মানুষ তাদের সাম্প্রদায়িক ও জাতীয় পরিচয় নিয়ে
ছিলো দ্বিধান্বিত। তিনি পশ্চিমবঙ্গের জলপাইগুড়ি শহরে ১৮৮৯ সালের ২৮ ডিসেম্বর জন্মগ্রহণ করেন। তার মাতার নাম মেহেরুন্নেসা, পিতার নাম মে․লবী আব্দুর রহমান। তার আদি পিতৃ-ভিটা বাংলাদেশের ফেনী জেলায়।
ইংরেজিতে
প্রবাদ রয়েছে- Morning Shows The Day- আহমেদ ফজলুর রহমান শৈশব থেকেই ছিলেন
বুদ্ধিমান, সচেতন ও প্রচন্ড মেধাবী। পরবর্তী সময়ে ধীরে ধীরে যার পরিস্ফুটন
দেখা যায়। মনোযোগী ও মেধাবী ফজলুর প্রথম থেকেই শ্রেণিকক্ষের শীর্ষস্থানটি
ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছিলেন। তিনি জলপাইগুড়ি জিলা স্কুল থেকে ১৯০৮ সালে
বৃত্তিসহ জেলার সেরা শিক্ষার্থী হিসেবে প্রবেশিকা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন।
উচ্চশিক্ষার আলোয় উদ্ভাসিত হতে এরপর তিনি পাড়ি জমান বিলেতে। ভর্তি হন
ইংল্যান্ডের অক্সফোর্ড বিশ^বিদ্যালয়ে। এ বিশ^বিদ্যালয় থেকে তিনি ১৯১২ সালে
ইতিহাসে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। এরপর তিনি লন্ডন স্কুল অব ইকোনমিক্সে
দুই বছর গবেষণা করেন। তার গবেষণার বিষয় ছিল ‘রাজনৈতিক অর্থনীতি’।
স্যার এ এফ রহমান: কর্মজীবন
‘বিদ্যা
বিনয় দান করে- বিনয় দ্বারা জগৎ বশিভূত হয়।’ তাই তিনিও গবেষণার দু’বছর পরে
দেশমাতৃকার টানে ফিরে আসেন মাতৃভূমিতে। যোগ দেন আলিগড় অ্যাংলো ওরিয়েন্টাল
কলেজে। যেটি এখন আলিগড় মুসলিম বিশ^বিদ্যালয় হিসেবে পরিচিত। সেখানে তার
পড়ানোর বিষয় ছিল ইতিহাস। তবে শুধু ইতিহাসের পাঠ্যসূচিতে নিজেকে সীমাবদ্ধ না
রেখে তিনি বিচরণ করেছিলেন জ্ঞানের সব স্তরেই। নিজস্ব চিন্তা-সে․কর্যও
প্রকাশরীতির অভিনবত্ব নিয়ে তিনি উজার করে দিতেন নিজেকে। উপমহাদেশীয় এ সমাজ
মানসে যে সংকীর্ণতা, কূপমুণ্ডকতা, অন্ধ ধর্মীয় বিশ্বাস ও গোড়ামী,
সাংস্কৃতিক সংকট, উচ্চশিক্ষা ও গবেষণাসহ নানা বিষয়ে বাস্তব চেতনার
সুসমন্বয়ে পড়ানোর মধ্যে তিনি ছিলেন যেমন ঋদ্ধ, তেমনি স্বাতন্ত্রমন্ডিত।
শুধু শিক্ষার্থীদের নিকটেই নয় তিনি জনপ্রিয়তা অর্জন করেছিলেন নিরক্ষর কৃষক
থেকে শুরু করে ইংরেজ শাসনের জাঁতাকলে শোষিত শ্রমিক ও দিনমজুরদের কাছেও।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও স্যার এ এফ রহমান:
কলকাতা
বিশ্ববিদ্যালয় কমিশনের একজন সদস্য হিসেবে স্যার আহমেদ ফজলুর রহমান ঢাকা
বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। ঢাকা
বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম ভাইস চ্যান্সেলর পি জে হার্টসের অনুরোধে তিনি আলীগড়
বিশ্ববিদ্যালয়ের চাকুরি ইস্তফা দিয়ে যোগ দেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস
বিভাগে। তার পদবী ছিল রিডার। যেটি এখন সহকারি অধ্যাপক হিসেবে পরিচিত। স্যার
আহমেদ ফজলুর রহমানের সাংগাঠনিক ও প্রশাসনিক দক্ষতায় মুগ্ধ হয়ে ব্রিটিশ
সরকার ১লা জুলাই ১৯৩৪ সালে তাঁকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলর
হিসেবে নিযুক্ত করেন। তিনি অত্যন্ত সফলভাবে ৩১ ডিসেম্বর ১৯৩৬ সাল পর্যন্ত
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন
উদ্যোগী স্যার এ এফ রহমান:
তিনি
সমকালীন সমাজ-সামাজিকের জীবনাকাঙ্ক্ষা এবং তাদের অসঙ্গিতসমূহ বিধৃত করার
উজ্জ্বল প্রয়াসে বিভোর থাকতেন। তিনি ভাবতেন কিভাবে উচ্চশিক্ষায় ভারতবাসীকে
আগ্রহী করে তোলা যায়। উপমহাদেশের মানুষ যেন নিরবচ্ছিনভাবে জ্ঞানের সুধারস ও
মুক্ত রাজ্যে বিচরণ করতে পারে সে নিয়ে তিনি নিয়মিত আলোচনা করতেন
বিদ্যানুরাগীদের সাথে। আন্তরিকতাপূর্ণ এবং কল্যাণকামী শক্তিতে বলীয়ান হয়ে
তিনি এফোরসেইড কলেজ প্রতিষ্ঠায় অগ্রনী ভূমিকা পালন করেন। সৃষ্টিশীল ও
সৃজনশীলতার প্রতিভায় নিরবচ্ছিন্নভাবে কলেজটি স্বকীয়তার ছাপ রেখে চললে
কলেজটিকে বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তরের উদ্যোগ নেয়া হয়। কলেজটিকে
বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তরের উদ্যোগীদের মধ্যে
স্যার
আহমেদ ফজলুর রহমান সদস্য সচিব হিসেবে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করেন। তিনি
যখন সৃজনশীলতার সূচনা করেছেন, উদার মানবতাবোধ ও প্রগতিশীলতার ঝাণ্ডা হাতে
এগিয়ে এসেছেন ঘুণে ধরা এই বাঙালি সমাজকে জাগাতে তখন দেশের আর্থ সামাজিক ও
রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে সবার জন্য শিক্ষালাভের সমান সুযোগ ছিল না। আর এ মহান
উদ্যোগটি গ্রহণ করেছিলেন স্যার আহমেদ ফজলুর রহমান।
শিক্ষানুরাগী হিসেবে স্যার এ এফ রহমান:
স্যার
আহমেদ ফজলুর রহমান দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করতেন একটি দেশের সম্ভাবনাময় তারুণ্যের
সৃজনশীলতার অবয়ব উন্মোচন করার ক্ষেত্রে শিক্ষার আধিক্য সবকিছুর উর্ধ্ধে।
তিনি খুব নিগুঢ়ভাবে শিক্ষার যথার্থতা বুঝতে পেরেছিলেন। তিনি একটি আদর্শ
সমাজ বিনির্মাণ করতে চেয়েছিলেন যার দরুন তিনি শিক্ষা বিস্তারের প্রতি
মনোনিবেশ করেন। সে সময় মানুষের জ্ঞানার্জন ও বিদ্যাচর্চা ছিল সীমিত। ঢাকা
বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হবার পর এ অঞ্চলের মানুষের মাঝে শিক্ষার আগ্রহ
সৃষ্টি হয়। শুরুর দিকে সমাজের উচ্চ ও বিত্ত শ্রেণির মাঝে
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানমুখী প্রবণতা সীমাবদ্ধতা ছিল।
পর্যায়ক্রমে
মধ্যবিত্ত পর্যন্ত জ্ঞানপিপাসু ধারা প্রবাহিত হয়। তাঁর পরিকল্পনায় স্থান
পায় ঢাকা অঞ্চলের অবহেলিত জনপদের উচ্চশিক্ষার জন্য কোনো প্রতিষ্ঠান
স্থাপনে। ততদিনে তার যশ খ্যাতি ছড়িয়ে পড়েছে চারদিকে। সাংগাঠনিক প্রজ্ঞা ও
দক্ষ প্রশাসকের গুলাবলিতে সাফল্য পান নতুন নতুন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান স্থাপন ও
শিক্ষানুরাগী কর্মসূচিতে। বিদ্যা প্রচারের এ ধারাবাহিকতায় কলকাতা
বিশ্ববিদ্যালয় কমিশনের সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। একজন স্বপ্নাদর্শী
বুদ্ধিজীবী হিসেবে
সমাজের আধুনিকায়নে তিনি জাতিকে যে পথ দেখিয়েছেন তাঁর এ অগ্রনী ভূমিকা সমাজে জ্ঞান প্রসার ও শিক্ষার আলো ছড়াতে ছিল অদ্বিতীয়।
সমাজ সংস্কারে স্যার এ এফ রহমান:
স্যার
আহমেদ ফজলুর রহমান সমাজের অসঙ্গতি দূর করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন
করেন। বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার দুই বছর পর ১৯২৩ সালের ডিসেম্বর মাসে ঢাকা
বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিনিধি হিসেবে রেজিস্টার্ড গ্র্যাজুয়েটদের ভোটে তিনি
তৎকালীন বঙ্গীয় আইনসভায় সদস্য নির্বাচিত হন।
১৯২৭
সালের নভেম্বও মাসে পুনরায় তিনি বিনা প্রতিদ্বন্দীতায় নীলফামারি (বর্তমানে
জেলা) আসন থেকে বঙ্গীয় আইন সভার সদস্য নির্বাচিত হন। আইনসভার সদস্য হিসেবে
কাজের মেয়াদ শেষ হলে
১৯৩২
সালে তিনি বঙ্গীয় ভোটাধিকার কমিটি ও পাঞ্জাব বিশ্ববিদ্যালয় কমিশনের সদস্য
নিযুক্ত হন। ১৯৩৪ সালে স্যার এ এফ রহমান ঢাকা মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক
শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
স্যার এ এফ রহমান: পুরস্কার ও সম্মাননা
কর্মপটু
স্যার এ এফ রহমানের কাজে মুগ্ধ হয়ে ব্রিটিশ সরকার ১৯৩৪ সালের ১লা জুলাই
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য নিযুক্ত করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম
বাঙালি উপাচার্য হিসেবে তিনি ১৯৩৬ সালের ৩১শে ডিসেম্বর পর্যন্ত কৃতিত্বের
সাথে দায়িত্ব পালন করেন। স্যার এ এফ রহমানের কৃতিত্ব ও গৌরবময় অবদানের জন্য
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ১৯৩৭ সালে তাঁকে সম্মানসূচক ডক্টর অব ল’
ডিগ্রী প্রদান করেন। ঐ বছরেই তিনি ভারতের ফেডারেল পাবলিক সার্ভিস কমিশনের
সদস্য নিযুক্ত হন। ব্রিটিশ সরকার আহমেদ ফজলুর রহমানের কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ
১৯৪২ সালে তাকে রাজকীয় ‘নাইট’ খেতাবে ভূষিত করেন।
মৃত্যুবরণ:
বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী এ মহান সাধক মাত্র ৫৬ বছর বয়সে পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করেন।
‘দুনিয়াতে মানুষের চেয়ে বড় কিছু নাই, আর মানুষের মাঝে মনের চেয়ে বড় কিছু নাই-
-স্যার উইলিয়াম হ্যামিলন।’
স্যার
আহমেদ ফজলুর রহমান ছিলেন আধুনিক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বপ্নদ্রষ্টাদের
মধ্যে অন্যতম। রাজনীতি, সমাজ সংস্কারে, শিক্ষায় তিনি দেশের বৃহত্তর অথচ
তৎকালীন অনগ্রসর সমাজকে অধিকার সচেতন করে তুলতে সাহসী ভূমিকা পালন
করেছিলেন। জীবনের শেষ দিনটি পর্যন্ত তার এই ভূমিকা অব্যাহত ছিল। স্বদেশ ও
সমাজের তৎকালীন পিছিয়ে পড়া মানুষকে দেখে তিনি চিরকাল উৎকন্ঠিত হয়েছেন।
সর্বদা নিজের দায়িত্ব পালন করেছেন।
জাতির প্রতি তার অবদান চির স্মরনীয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতি তাঁর অবদান অনস্বীকার্য।
ইমদাদুল আজাদ
ইস: ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগ
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
imdadul1819@gmail.com



0 coment rios: